হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব মাওলানা মেশকাত উদ্দীন (রঃ)

হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব মাওলানা মেশকাত উদ্দীন (রঃ)

মুহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ :::

মানুষ মরনশীল। মানুষকে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করতে হবে। এটাই এই সুন্দর পৃথিবীর বাস্তবতা। কেউ এখানে চির দিন থাকতে পারবেনা। শত চেষ্টা করেও কেউ অনন্ত কাল বেঁচে থাকতে পারবেনা। এই উপলব্ধি প্রত্যেক মানুষের আছে। তথাপি বেঁচে থাকার তাড়না প্রত্যেকে অনুভব করে। এই পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ জন্মে যাদেরকে যুগ যুগ ধরে স্মরণ করে। কর্মের মাধ্যমে অন্যান্য মানুষের জন্য অনুকরনীয় অনুস্মরণীয় হয়ে থাকে। এ ধরনের ব্যক্তিত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রেরনা যোগায়। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তার এবং তাঁর প্রিয় হাবীব (দঃ) এর শিক্ষাকে পৃথিবীর মানুষের কাছে সুবিন্যস্ত ভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য কিছু মানুষকে যোগ্যতা দান করেন। তাঁরা আল্লাহ পাকের প্রদত্ত যোগ্যতাবলে ইসলামের শিক্ষাকে সমুন্নত রাখতে কঠোর সংগ্রাম করেন। এ সকল সংগ্রামী মহা পরুষদের মধ্যে একজন হলেন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন হযরতুল আল্লামা আলহাজ¦ মাওলানা মেশকাত উদ্দীন (রহঃ)। যাঁর সারাটি জীবন উৎসর্গ করেছেন ইসলামের খেদমতে। এ স্বল্প পরিসরে তাঁর জীবনের কিছু অংশ আলোচনা করার চেষ্টা করব, যাতে করে মানুষ তা থেকে শিক্ষা গ্রহন করে উপকৃত হতে পারে, নিজেদের জীবনকে সুন্দর ভাবে পরিচালিত করতে পারে।
জন্মঃ ১৯২৩ ইং সালে তিনি জন্ম গ্রহন করেন।

জন্মস্থানঃ হাজারো পীর আওলীয়ার পুন্যভুমি চট্টগ্রাম এর ঐতিহ্যবাহী থানা মীরসরাই এর অন্তর্গত ইছাখালী গ্রামে। পিতাঃ- মাওলানা ইছহাক (রহঃ)। তিনি ফুরফুরা দরবার শরীফের খলিফা ছিলেন। দাদাঃ- মাওলানা গোলাম (রহঃ)। তিনি ফুরফুরা দরবার শরীফের একজন সুযোগ্য খলিফা ছিলেন। তাঁর অনেক কারামতের কথা এখনো লোক মুখে শুনা যায়। তিনি খুবই উঁচু মানের একজন আল্লাহর ওলী ছিলেন। প্রচার বিমুখ এই মহান সূফী সাধকের মাজার শরীফ এ গ্রামে অবস্থিত।

প্রাথমিক শিক্ষা : পিতা এবং পিতামহের হাতে জনাব মাওলানা মেশকাত উদ্দীন (রাঃ) এর প্রাথমিক শিক্ষায় হাতে খুড়ি। তাদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি মীরসরাই এর ঐতিহ্যবাহী দ্বিনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুফিয়া নূরিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তাঁর অসাধারন ধী শক্তি, তীক্ষন মেধা অল্প সময়ের মধ্যে তাকে সে মাদ্রাসার সেরা ছাত্রে পরিণত করে। তারই সুবাধে তিনি তৎকালিন সময়ের চেষ্টা আলেমের মুফতি আজম হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল গণী (রাঃ) এর একান্ত সান্নিধ্য লাভ করতে সক্ষম হয়। তথন এই এলাকায় একটি প্রচলিত ছিল যে মাওলানা আব্দুল গণী (রাঃ) এর নেক নজর প্রাপ্ত হয়েছে সে প্রকৃত মানুষ হয়েছে। সফলতা তাকে আলিঙ্গন করছে। মাওলানা মেশকাত উদ্দিন (রাঃ) এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেনি। তাঁর কাছ থেকে তিনি হাদিস, ফিকহ্, বালাগাত, তাছাউপ অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি পন্ডিত্য লাভ করতে সক্ষম হন।

উচ্চ শিক্ষা : অতঃপর সুফিয়ার হুজুর কেবলা (রাঃ) নির্দেশ ক্রমে হাদিসের উপর উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের জন্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বিনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম আলীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে সফলতার সাথে কামিল-হাদিস সমাপ্ত করেন।

কর্মজীবন : তার বর্ণাঢ্য কর্ম জীবন শুরু হয় শিক্ষকতার মাধ্যমে। তিনি চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর কয়েকটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
সর্বপ্রথম তিনি মীরসরাইয়ের আবুরহাট মুনিরুল ইসলাম মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে কর্মময় জীবনের সূচনা করেন। প্রায় ৪বছর পর্যন্ত তিনি ঐ মাদ্রাসায় অত্যান্ত দক্ষতার সাথে হাদিসের দরস দান করে একজন সুযোগ্য মুহাদ্দিস হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। এরপর শান্তিরহাট মাদ্রাসায় প্রায় তিন বছর শিক্ষকতায় নিয়োজিত থাকেন। সেখানে শিক্ষকতায় নিয়োজিত থাকা কালীন সময়ে মীরসরাইয়ের আর একটি ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লতীফিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার (বর্তমান আলিয়া) সুযোগ্য অধ্যক্ষ একরামুল হক (রাঃ) এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি সে মাদ্রাসার হেড মাওলানা পদ অলংকৃত করেন। শিক্ষার অনুকুল পরিবেশ পেয়ে তিনি সেখানে প্রায় ২০বছর যাবৎ সে পদে বহাল থেকে আস্থাভাজন শিক্ষকে পরিণত হন। আরও লোভনীয় পদের সুযোগ পাওয়া সত্বেও তিনি হেড মাওলানার পদ ছাড়েননি। নির্ভেজাল নিরহংকার. নিলোর্ভ মানুষ মাওলানা মেশকাত উদ্দিন (রাঃ) যোগ্যতা এবং সুযোগ থাকার সত্বেও কখনো প্রশাসনিক পদ গ্রহন করেননি। তার যৌবনের পুরোটা সময় তিনি এলাকার মানুষের সাথে কাটিয়েছেন। এলাকার মানুষকে ইসলামের সুশিক্ষায় দান করার প্রবনতা থেকে বুঝা যায় যে, তিনি একজন দায়িত্ব বান মহান আলেমে দ্বীন। নিজ এলাকার মানুষের ইহকালীন কল্যাণ এবং পরকালীন মুক্তির শিক্ষা দান তাঁর দায়িত্ব বোধের পরিচায়ক। ১৯৮০ইং সালে তাঁর বাল্য বন্ধু মীরসরাইয়ের আর এক কৃতি সন্তান মুফতি আহলে সুন্নাত হযরতুল আল্লামা আলহাজ¦ মাওলানা মুজাফ্ফর আহম্মদ (রাঃ) এর আহ্বানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম নেছারীয়া আলীয়া মাদ্রাসার হেড মাওলানা পদে যোগদান করেন। পাশাপাশি মাদার বাড়ীর জামে মসজিদ পেস ইমামেরও দায়িত্বভার গ্রহন করেন। মাওলানা মুফতি মুজাফ্ফর আহম্মদ (রাঃ) সান্নিধ্য তাঁকে চট্টগ্রাম শহরে ব্যাপক পরিচিতি এনে দে। মুফতি মুজাফ্ফর আহম্মদ (রাঃ) এর সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ছিলো নিখুঁত। দুনিয়ার কোনো স্বার্থ তাদের বুন্ধুত্বে ক্ষনিকের জন্যও পাটল দরাতে পারেনি। হুব্বুন ফিল্লাহ্ এর শিক্ষা তাঁদের থেকে গ্রহণ করা যায়।

তাঁর প্রশাসনিক যোগ্যতার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় নেছারীয়া আলীয়া মাদ্রাসায়। কেননা মাওলানা মুফতি মুজাফ্ফর আহম্মদ (রাঃ) যে কোন সমস্যায় তাঁর পরামর্শ কামনা করতেন এবং তিনিও অত্যান্ত বিচক্ষনতার সাথে জটিল সমস্যার সঠিক সমাধান করতে পারতেন। ১৯৯৬ ইং সালে তিনি মাদ্রাসা থেকে অবসর গ্রহন করলেও আমৃত্য তিনি মাদ্রাসার সাথে অঙ্গাঙ্গীক ভাবে জড়িত ছিলেন। শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি মাদার বাড়ী পাম্প হাউজ মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ইন্তেকাল : মহান রাব্বুল আলামীনের বাণী “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে” নবী, রাসুল, মহামনীষি, প্রতাপশালী বাদশাহ কারো ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেনি। যারা আল্লাহ পাকের প্রিয় বান্দা তারা আল্লাহর সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকে। তারা মাওলার ডাকে সাড়া দিতে সদা প্রস্তুত। দুনিয়ার কোন মোহ, লোভ-লালসা তাতে বাধা হয়ে দাড়াতে পারেনা। সঠিক দ্বীন, সময়, ক্ষণিক অপেক্ষায় থাকেন। ঠিক তেমনি ভাবে মাওলানা মেশকাত উদ্দিন (রাঃ) এর সেই অপেক্ষার পালা শেষ হয়েছে। গত ২/৯/২০০৪ ইং, রোজ বৃহস্পতিবার, ভোর ৫টা ১০ মিনিটের সময় তাঁর বড় ছেলের বাসায় লক্ষ ছাত্র, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে মহান প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবী মায়া ত্যাগ করে তাঁর সান্নিধ্যে গমন করেন। ইন্না………….ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। মৃত্যু কালে তিনি সুযোগ্য চার ছেলে এবং কন্যাকে রেখে যান। উনার মেঝ ছেলে জনাব রেজাউল হক রেজা, ফেনী পল্লিবিদ্যুৎ সমিতির পরিচালক এর দায়িত্বে আছেন। জানাযা :- চট্টগ্রাম নেছারীয়া আলীয়া মাদ্রাসার বিশাল ময়দানে অত্র মাদ্রাসার সুযোগ্য অধ্যক্ষ জনাব আলহাজ¦ মাওলানা শাখাওয়াত হোসেনের ইমামতিতে জানাযার প্রথম জামায়াত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ১০টা ২০ মিনিটে।

অতঃপর নিজ জন্ম স্থান ইছাখালী বিকাল ৪টায় জনাব আলহাজ¦ মাওলানা আব্দুল হাই, সাইখুল হাদিস, ছুন্নতি আলীয়া মাদ্রাসার ইমামতিতে দ্বিতীয় জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়।

দাফন : দ্বিতীয় জানাযার নামাজান্তে কেবলা (রাঃ) পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর পরম শ্রদ্ধা ভাজন দাদা অলীকুল শিরমনি হযরতুল আল্লামা শাহ্ গোলাম রহমান (রাঃ) এর মাজারের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। দাপনের পর সীতাকুন্ড আলীয়া মাদ্রাসার সহ অধ্যক্ষ হযরত মাওলানা ফজলুল মুনাজাত পরিচালনা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!