সত্তর দশকের গ্রামের রোজা ও ঈদ

সত্তর দশকের গ্রামের রোজা ও ঈদ

শাহ আলম নিপু :::

ঈদ মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। বিশেষ করে ঈদ-উল ফিতর বা রমজানের ঈদ। দীর্ঘ ৩০ দিন সিয়াম সাধনার পর আসে এ পবিত্র ঈদ। বলা যায় এ ঈদের মানসিক প্রস্তুুতি শুরু হয় সে প্রথম রমজান থেকেই। বড়রা পুরো রমজান মাসে রোজা রেখে আখেরাতে তার সওয়াবের পাল্লা ভারী করার জন্য যথাসম্ভব নামাজ-দোয়া করে, এবাদতে ব্যস্ত থাকেন পুরো মাস। পাশাপাশি ছোটরাও চেষ্টা করে তার আনন্দের ঈদকে অর্থবহ ও নিজের সওয়াবের পাল্লা ভারী করতে। অতি অল্প বয়স থেকে ছোটরাও চেষ্টা করে রোজা রাখতে। প্রথম বছর অনন্ত প্রথম রোজাটা যেন রাখা যায়। তারপরের বছর থেকে প্রথম, সাতাশ এবং শেষ রোজা। ক্রমান্বয়ে যোগ হয় শুক্রবারের রোজাও। পরবর্তীতে ছোটদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় কে কয়টা রোজা রাখতে পারে তা নিয়ে। ঈদের দিন সকালে চলে নিজেদের মধ্যে তার হিসেব নিকেশ। বাবা মারাও সহযোগীতা করেন ছোটদের রোজা রাখার এ প্রতিযোগীতাকে। এভাবে একসময় তারা পুরো রোজার মাস রোজা রাখার ভিত রচনা করে। রোজার মাসে পুরো মাসটাই রোজা পালন ও এবাদতের পাশাপাশি চলে ঈদের দিনের আয়োজন। সেকালে ঈদের দিনের খাবারের তালিকা জুড়ে থাকতো তাতে তৈরি পিঠা। নানান রকমের চালের পিঠা। কিছু কিছু ময়দার পিঠাও তৈরি করা হতো। প্রথম রোজা থেকে বানানো শুরু হতো ‘চুটকি পিঠা’। বাড়ির ছোট বড় সব মেয়েরাই হাতের দু’আঙ্গুলে পিষে পিষে নিপুণভাবে তৈরি করতো এ পিঠা। গল্প গুজবের ফাঁকে ফাঁকে পুরো রোজার মাস অল্প অল্প করে ‘চুটকি পিঠা’ তৈরি হতো। ঈদের দিন সকালে ঘিয়ে ভেজে দুধ, চিনি দিয়ে রান্না করে এ পিঠা পরিবেশন করা হতো। ঈদের দিনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পিঠা ছিল ‘ছে্ইঁ পিঠা’। চালের গুড়া সিদ্ধ করে লতা বানিয়ে হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে এ পিঠা তৈরি করা হতো রোজার মাসের মাঝামাঝি থেকে। চুটকি পিঠার আকৃতির একটু বড় সাইজের এ ছেঁই পিঠা তৈরিটা ছিলো খুভ উপভোগ্য। একেক দিন একেক ঘরে আয়োজন হতো এ পিঠা তৈরি। অন্যান্য ঘরের মহিলারাও স্বতস্ফূর্তভাবে এ পিঠা তৈরিতে সাহয্যে এগিয়ে আসতো। সবাই পিঠা বানানোর বেলুইন-পিড়া নিয়ে গোল হয়ে বসতো। কেউ লতা বানাচ্ছে। কেউবা লতা পিঠা বানাচ্ছে। অপূর্ব এক দৃশ্য। পালাক্রমে সব ঘরেই চলতো এ পিঠা বানানোর আয়োজন। এছাড়াও ঈদের দিন প্রায় ঘরেই তৈরি হতো ফিরনি, পায়েস, জর্দা, নারিকেল পিঠা, পুয়া পিঠা, ছাঁচি পিঠা ইত্যাদি। বর্তমান যন্ত্রের যুগে কলের সেমাই, লাচ্ছা সেমাই ঈদের দিনের আয়োজনের সে আনন্দটা ম্লান করে দিয়েছে। সেহেরী ও ইফতারের সময় তখনকার বেশ সমস্যা হতো। এখনকার মত তখন টেলিভিশন ছিলনা। গ্রামের ঘরগুলোতে রেডিও ছিল কদাচিৎ। মসজিদগুলোতে মাইকের ব্যবহার শুরু হয়নি। ইফতার করার জন্য মসজিদের সামনে গিয়ে দেখে আসতে হতো বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাক্তির উপর, তিনি ইফতার করেছেন কিনা। তখন একটা কথা প্রচলন ছিল ইফতার ও সেহেরী খাওয়ার সময় নির্ধারণ হতো শরীরের লোম দেখা না দেখা নিয়ে। রেডিও, টেলিভিশনের অভাবে ১৯৬৭ সনে একবার রোজার ঈদ নিয়ে সবাই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। ২৯ রোজার পর সন্ধ্যায় ঈদের চাঁদ দেখা না যাওয়াতে রোজাদাররা যথা নিয়মে তারাবীর নামাজ পড়েছে এবং সেহেরী খেয়ে রোজা রেখেছেন। ভোর রাতে রেডিওতে যোঘণা দিয়েছে দেশের কোথাও কোথাও চাঁদ দেখা দিয়েছে সুতরাং আগামীকাল ঈদ। যে সব গ্রাম/বাড়িতে রেডিও ছিল তারা ঈদ করার সিদ্ধান্ত নিল। তাও গ্রামের অনেক লোক এটা মানতে রাজি হয়নি। নিজ চোখে চাঁদ না দেখে তারা ঈদ করবেনা। ফলে কোন কোন গ্রামে ঈদ হলো, কোন কোন গ্রামে ঈদ হলো না। দুইদিন ঈদ করলো গ্রামবাসীরা। প্রথম ঈদ উপলক্ষে কোন কোন বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দেখা গেল তারা রোজা পালন করছে।

সেকালে ঈদগাগের জামাতগুলো অনেক জায়গায় পরিবার নির্ভর ছিল। বেশির ভাগ ঈদগাহ ছিল বড় বাগিগুলোর দানে প্রতিষ্ঠিত। সেজন্য ঈদ জামাতে তাদের প্রভাবও ছিল উল্লেখ করার মত। ঐ সব বাড়ির লোকজন না আসা পর্যন্ত ঈদ জামাত হতো না। জামাতের জন্য নির্দিষ্ট কোন সময় নির্ধারিত থাকতো না। ঐ সব বাড়ির অনেক সদস্য ঈদের দিন সকাল বেলা বাজারে গিয়ে চুল কাটাতো। এ সব কারণে জামাত শুরু হতে অনেক সময় দেখা গেছে বেলা ১১টা সাড়ে ১১টা বেজে গেছে। ঈদের চুল কাটানোও তখন খুভ উপভোগ্য ছিল। এখনকার মত তখন কোন সুদৃশ্য সেলুন ছিলনা। সাতাশ রোজা থেকে নাপিত তার সরাঞ্জামাদি নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরতো। বাড়ির ছেলে বুড়ো সবাই এক এক করে কাছারী ঘরের সামনে চৌকি-পিড়াতে বসে চুল কাটাতো। চুল কাটার নির্দিষ্ট কোন ফি ছিল না। নাপিতরা ধান/চাল বা টাকা বখশিষ নিয়ে চলে যেত। অনেক বাড়িতে তখন সাতাশ রোজার দিন মেজবান হতো। ঐ বাড়ির সমাজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। কোন কোন বাড়ির সাতাইশা অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা করে জমি ও পুকুরও ছিল। যার আয় দিয়ে ঐ মেজবানের খরচ নির্বাহ করা হতো। পুকুর থেকে সদ্য তোলা মাছ আর তাজা সবজির তরকারি সবাইকে রসনাতৃপ্ত করতো। কালের আবর্তে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ঐ প্রথা এখন অনেক জায়গায় বিলীন চলেছে। গ্রামের ঈদগুলোতে জমজমাট ভাব শুরু হয় স্কুল কলেজগুলো বন্ধ হওয়ার পর থেকেই। স্কুল কলেজ বন্ধ হলে শহরে অবস্থানরত পরিবারগুলো ঈদকে সামনে রেখে গ্রামের বাড়িতে আসতে শুরু করে। তখন বাড়িতে আসার ঝক্কি-ঝামেলাও কম ছিলো না। রাস্তাঘাট তেমন উন্নত ছিল না। ঢাকা-চট্টগ্রামের ট্রাঙ্ক রোড ছিলো অপ্রশস্ত। ব্রিটিশ আমলেন সিমেন্ট-কংক্রিটের ঢালাই করা। মাঝে মাঝে ফাটা ফাটা। বাসগুলোও ছিল বেডফোর্ড ইঞ্জিনের এবং কাঠের বডির। সিটগুলো চারিদিকে বেঞ্চ বসানোর মত। এখনকার মত এত উন্নতমানের দুরপাল্লার কোন বাস ছিলো না। ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে পরিবারগুলো আসতো বেশির ভাগই ট্রেনে। কয়লার ঈঞ্জিনের ট্রেনে কালো ধোঁয়া তুলে হিস্ হিস্ আওয়াজ করে চলতো। ঢাকা থেকে সন্ধ্যার দিকে একটি ট্রেন ছাড়তো লোকাল ট্রেন। সেটি প্রতিটি স্টেশনে থেমে থেকে মীরসরাই স্টেশনে এসে থামতো পরদিন কাক ডাকা ভোরে। মীরসরাই স্টেশন থেকে বাড়িতে আসতে হতো গরুর গাড়িতে। স্টেশন থেকে ট্রাঙ্ক রোড পর্যন্ত ছিল মাটির রাস্তা। ঝুপড়ি দেয়া গরুর গাড়ি হেলে-দুলে কেঁত কেঁত শব্দ করে চলতো। বাড়ী আসার আমেজটাই ছিল আলাদা। মহিলাদের স্টেশন থেকে বাড়ি যাওয়ার জন্য ছিলো পালকি। পালকির বেয়ারারা হেঁইও হেঁইও সুর করে করে দৌড়াতো। পরবর্তীতে রাস্তায় ইট বসে। রিক্সারও প্রচলন শুরু হয়। চট্টগ্রাম থেকেও বেশির ভাগ যাত্রী আসতো ট্রেনে। লোকাল ট্রেন প্রতিটি স্টেশনে থেমে থেমে চলতো। ঈদের দিন ঘরে ঘরে গিয়ে বাড়ির সবাইকে ফজরের নামাজের আযানের সঙ্গে সঙ্গে ডাকা হতো। ফজরের নামাজ পড়া হতো জামাতে। দু’এক ঘরে ঈদের সেমাই, পিঠা, তৈরি হয়ে যেতো আগে ভাগেই। ঐ ঘরগুলো থেকে আপ্যায়নের জন্য হাঁক ডাক শুরু হয়ে যেতো। গোসল করে নতুন জামা কাপড় পড়ে বাড়ি ছেলে-বুড়ো সবাই দল বেঁধে ঈদগাহের দিকে রওয়ানা হতো।

আগে উল্লেখ করেছি ঈদ জামাত হতে হতে ১১টা সাড়ে ১১টা বেজে যেতো। সবাই অপেক্ষা করতো চারিদিক থেকে মুসল্লিরা আসা শেষ পর্যন্ত।
ঈদের মাঠে কোলাকুলি তারপর ফিরে এসে ঘরে ঘরে মা, দাদী, চাচী, আর ভাবীদের কদমবুচির পালা। সালাম করার পর সবাইকে কোলে নিয়ে দোয়া করতেন তারা। বড় দেবরদের ভাবীদের কোলে বসা নিয়ে ঠাট্টা-দুষ্টুমিও হতো। তারপর চলতে ঘরে ঘরে খাওয়া দাওয়ার পালা।
ঈদের সালামীর প্রচলন সবসময় ছিল। তখনকার দিনে সালামের পর এক আনা/দু’আনা করে দেয়া হতো। তা নিয়ে বাজারে বা ঈদ মেলাতে যাওয়া হতো। মোয়া চিরার নাড়– বুট নকল দানা (চিনি মিশ্রিত বুট) আঙ্গুরী, মিঠাই ইত্যাদি কিনে খেতো ছেলে মেয়েরা। সফ্ট ড্রিংকস হিসেবে পাওয়া যেতো এক ধরনের সোডা ওয়াটার। সোডা ওয়াটারের বোতলের মুখে ছিপি হিসেবে থাকতো মার্বেল। ক্রেতাকে দেয়ার আগে মার্বেলের চাপ দিতো। ফস করে আওয়াজ হয়ে মার্বেল ভিতরে চলে যেতো। ঝাঁঝালো সোডা ওয়াটার তৃষ্ণা মেটাতো। পরবর্তীতে ভিটাকোলার প্রচলন ছিলো অনেক দিন। কো-পেপসির প্রচলন শুরু হয় আরো অনেক পরে। ঈদ উপলক্ষে আয়োজন হতো ফুটবল ও ভলিবল খেলার। এক বাড়ির সঙ্গে অন্য বাড়ি বা এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের ফুটবল খেলা নিয়ে পুরো বিকেলটা মেতে থাকতো সবাই। খেলার পাদর্শিতা যতোনা আয়োজনের ঘটা থাকতো তার চাইতে বেশি। এছাড়াও বাড়িতে ছেলেমেয়েরা খেলতো-এক্কা, দোক্কা, মার্বেল, সাত-চারা, লুকোচুরি, আঁকা-আঁকি (আড়ালে থেকে বিভিন্ন দাগ দিয়ে তা খুঁজে বের করা) দুদ্ধা খেলা (গাছে গাছে লুকোচুরি), খাদ্য (তেতুল বিপি বা খেজুর বিচি দিয়ে ছোট ছোট গর্তে এক ধরনের খেলা) ডাংগুলি ইত্যাদি নানা ধরনের মজার মজার খেলাগুলো।

টিভি তো ছিলোই না, রেডিও ছিলো খুব কম। তাই সন্ধ্যার পর বসতো বাড়ির উঠানে বা ডেলায় (বাহির বারান্দা) ধাঁ-ধাঁর আসর (ভাঙ্গানি কিস্সা) আর গল্পের আসর। মজার মজার সব গল্প। ছেলেমেয়েরা গল্প শুনতে বিচরণ করতো কল্পনার রাজ্যে।
টেপরেকর্ডারের তখন প্রচল হয়নি। তবে বনেদি দু/এক পরিবারের কলের গান ছিলো। “হিজ মাস্টার ভয়েস” এর রেকর্ডের পুরানো দিনের গানগুলো সবাইকে বিমোহিত করতো। ঈদের পরের দিন থেকে শুরু হতো নানার বাড়ি, ফুফুর বাড়ি আর খালার বাড়িতে বেড়ানো পালা। র্দীঘ আমেজে এভাবেই শেষ হতো তখনকার দিনের ঈদগুলো।
শাহ আলম নিপু, মুদ্রাকর ও প্রকাশক
সিনেট সদস্য-চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়
সভাপতি কলাধারা পরিষদ
লাইফ গভর্ণর-এপেক্স বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!