রুহি দাশ এখন মস্ত বড় ডাক্তার !

রুহি দাশ এখন মস্ত বড় ডাক্তার !

আজিজ আজহার/ সাদমান সময়:::

রুহি দাশ এখন মস্ত বড় ডাক্তার! প্রাতিষ্ঠানিক কোন ডিগ্রি না থাকলেও সাদা কাগজে দুর্বোধ্য স্বাক্ষর দিয়ে দেন ব্যবস্থা পত্র। ওই ব্যবস্থা পত্রে থাকে না চিকিৎসকের নাম ডিগ্রি কিংবা ঠিকানা। তিনি প্রতিজন রোগী থেকে ফি হিসেবে নেন একশ থেকে তিনশ টাকা। রুহি দাশের চেম্বার মিরসরাই পৌর বাজারের মাস্টার মেডিক্যাল ফার্মেসী।

কে এই রুহি দাশ, কী করে তিনি বনে গেলেন ডাক্তার! মিরসরাইনিউজ এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। জানা যায়, রুহি দাশ প্রকাশ এমডি রুহির বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মসজিদিয়া ইউনিয়নের উত্তর মসজিদিয়া গ্রামে। তিনি গ্রামের ক্ষিতিশ চন্দ্র দাশের পুত্র। স্থানীয় একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করার পর চট্টগ্রাম কন্টিনেন্টাল ইন্সটিটিউট অব মেডিক্যাল টেকনোলজি নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এক বছর মেয়াদী প্যারামেডিক্যাল কোর্স সম্পন্ন করেন।

এরপর মেডিক্যাল টেকনেশিয়ান হিসেবে চাকরী নেন মিরসরাই উপজেলার ভার্ক মা ও শিশু হাসপাতাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানে। সেখানে কয়েক বছর চাকরী করার পর বনে যান চিকিৎসক। চেম্বার খুলে বসেন মিরসরাই পৌর বাজারেরর মাস্টার মেডিক্যাল ফার্মেসীতে। বর্তমানে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন রুহি। তবে আইনি জটিলতা এড়াতে শুধুমাত্র সাদা কাগজে দেয়া ওইসকল ব্যবস্থাপত্রে রয়েছে তার দুর্বোধ্য একটি স্বাক্ষর। যা দিয়ে খালি চোখে রুহির প্রতারণা বোঝা বা প্রমাণ করা অসাধ্য।

এক বছর মেয়াদী প্যারামেডিক্যাল কোর্স দিয়ে কোন রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দেয়া যায় কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কন্টিনেন্টাল ইন্সটিটিউট অব মেডিক্যাল টেকনোলজির পরিচালক ডা. সরোয়ার আলম বলেন, ‘রুহি দাশ আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে যে কোর্স করেছে তাতে চিকিৎসক হয়ে রোগী দেখার বা ব্যবস্থাপত্র দেয়ার কোন সুযোগ নেই। এটি সম্পূন্ন বেআইনি।’

গত ২৮ অক্টোবর সকালে পৌর বাজারের মাস্টার মেডিক্যাল ফার্মেসীতে রুহির চেম্বারে গিয়ে দেখা যায় তিনি চিকিৎসক সেজে ষাট বছর বয়সী এক রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। তখনও বাহিরে অপেক্ষমান অনেক রোগী। কয়েকজন রোগীর কাজ থেকে রুহির দেয়া ব্যবস্থাপত্র নিয়ে দেখা যায়, একটি সাদা কাগজে হরেক রকমের ওষুধ লিখে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যবস্থাপত্রের পাশে লিখে দেয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি টেস্ট।

কথিত চিকিৎসক রুহি দাশের চেম্বারে আসা রোগী খুরশিদ আলমের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ভাই আসল নকল ডাক্তার চেনার ক্ষমতা আমাদের মত সাধারণ মানুষের নেই। ফার্মেসীতে একজন ডাক্তার বসেন জেনে আমি তাকে দেখাতে এসেছি।’
পরক্ষণে ব্যবস্থাপত্রে ডাক্তারের নাম পদবী ও ডিগ্রি লেখা না থাকার বিষয়টি কথিত চিকিৎসক রুহির কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমি ওইসকল রোগী গরীব বলে চিকিৎসাপত্র লিখে দিয়েছি তাই ব্যবস্থাপত্রে কোন নাম লেখা হয়নি।’ অবশ্য এসময় রুহি স্বীকার করেন তার নামে ছাপানো প্যাড আছে।

চিকিৎসক হিসেবে রুহি দাশের কাছে কোন প্রাতিষ্ঠানিক সনদ আছে কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে চট্টগ্রাম কন্টিনেন্টাল ইন্সটিটিউট অব মেডিক্যাল টেকনোলজি নামক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া এক বছর মেয়াদী প্যারামেডিক্যাল কোর্সের সনদপত্র আছে।’ অবশ্য এসময় রুহির কাছে ওই সনদটি দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেন নি।

এদিকে রুহি দাশের কর্মস্থল ভার্ক মা ও শিশু হাসপাতালের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ভার্ক এর চট্টগ্রাম এরিয়া কোর্ডিনেটর আলহাজ্ব মিয়ার সাথে রুহির ডাক্তার বনে যাওয়া বিষয়ে কথা বললে তিনি বলেন, ‘রুহি ল্যাব টেকনেশিয়ান ডাক্তার নন। সে ভার্ক পরিচালিত হাসপাতালের বাইরে কোথাও গিয়ে ডাক্তার সেজে রোগীদের সাথে প্রতারণা করলে সে দায়িত্ব আমরা নেব না।’

রুহির প্রতারণার বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈয়দ নুরুল আফছার বলেন, ‘একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান কোনভাবেই ডাক্তার সেজে রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিতে পারে না। এটা অবৈধ কাজ। উপজেলা প্রশাসন চাইলে এই বিষয়ে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।’

বিষয়টি মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমীনকে জানানো হলে তিনি মিরসরাইনিউজকে বলেন, এভাবে রোগী দেখা অবৈধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!