তিন অন্ধ কিশোরের গল্প

তিন অন্ধ কিশোরের গল্প

অনুসন্ধান ডেস্ক:
ওদের তিন জনের চোখে আলো নেই। অথচ বাই সাইকেল চালনা, সুচারুভাবে বৈদ্যুতিক কাজ করা, অনেক উঁচু গাছগাছালিতে চষে বেড়ানো, খেতখামারের কাজ করা, মাইকিং করা যেন কোন ব্যাপারই না তাদের কাছে। কেউ জন্মগত কেউবা ভুল চিকিৎসায় হারিয়েছে চোখের আলো। তবুও ওরা বোঝা নয় পরিবার-সমাজের কাছে। মেজবা, হিরু ও মাসুদ নামের তিন যুবক আজ মিরসরাইয়ের বিস্ময়। ওদের নিয়ে নিজেদের গ্রামে যেমন কৌতুহলের শেষ নেই, তেমনি আছে বুকভরা গর্বও।

সাইকেল চালনায় পারদর্শী হিরু :
মুক্তিযোদ্ধা বাবার অভাবের ঘরে ছয় সন্তানের মধ্যে তৃতীয় ইসমাঈল হোসেন হিরু। ছয় বছর বয়সে হাম রোগে আক্রান্ত হলে কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় দুই চোখের দৃষ্টি চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়। অভাবের সংসারে হিরুর এমন পরিণতিতে ভেঙে পড়েন বাবা-মা। পঞ্চম শ্রেণির গ-ি আর পার হওয়া যায়নি। আস্তে আস্তে শুরু হয় জীবন গড়া। বিয়ে হয়, দাম্পত্য জীবনে হয়েছে দুটি সন্তান। স্ত্রী আয়শা বেগমও স্বামীকে নিয়ে বেশ সুখী। তার বাড়ি মীরসরাইয়ের মিঠানালায়।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিরু নিজেকে বিস্ময় হিসেবে আবিস্কার করতে থাকেন মাত্র ১০ বছর বয়সে। একদিন গ্রামের মানুষ তাকে সাইকেল চালাতে দেখে অবাক না হয়ে পারেননি। পরে সেটি তার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকই হয়ে উঠেছে। জানা গেছে, হিরু বেশ কয়েকবার সাইকেল নিয়ে মহাসড়ক পাড়ি দিয়ে ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম শহরে গেছে আত্মীয়ের বাড়িতে। হিরুর আছে মোবাইল ফোন। ফোনের কোন বাটন কোথায় আছে, অপশনের ভেতরের অপশন খুঁজে প্রয়োজন মেটাতে তার কারো সাহায্য লাগে না। নারকেল, সুপারি কিংবা তাল পাড়তে লম্বা গাছে উঠতে হিরুকে সবার আগে ডাকে গ্রামের মানুষ। পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরাও তার কাছে নতুন কিছু নয়। এতকিছুর বাইরেও তার দখল আছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহু ইতিহাসে। গ্রামের মানুষ খবরের কাগজ পড়ে বা অন্যভাবে আলোচনা করলে কান পেতে শুনে থাকে হিরু। এমন সব বিস্ময়কর ঘটনা প্রসঙ্গে হিরু বলে, ‘চেষ্টা করলে কোন কাজই অসাধ্য থাকে না’।

বৈদ্যুতিক কাজ করে মেজবা :
মীরসরাই পৌরসদরের মধ্যম মঘাদিয়া গ্রামের জামাল উল্ল্যাহর নয় সন্তানের সবার ছোট মেজবা উদ্দিন। জীবনে কখনো আলোর দেখা পায়নি। পড়াশোনা ভাগ্যে জোটেনি, তবে গ্রামের ফোরকানিয়া মাদ্রাসা থেকে নিয়েছে পবিত্র কোরআন শিক্ষা। স্বাবলম্বী হওয়ার যুদ্ধে নেমে মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে শিখতে শুরু করে বৈদ্যুতিক কাজ। এখন তিনি সাবলীলভাবেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংযোগ স্থাপন করছেন মানুষের ঘরে ঘরে। একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত কোন বেকায়দায় পড়তে হয়নি তাকে। এ ছাড়া সাবলীল ভাষা আর সুমধুর কণ্ঠে তার মাইকিং অন্যের মনযোগ আকর্ষণ করবেই। আচার-অনুষ্ঠান কিংবা নির্বাচনী প্রচারণায় মাইকিংয়ে মেজবার কদর বেশ ভালই।
একজন স্বাভাবিক মানুষের চাইতে মেজবা কোনভাবেই কম নয় মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে। একবার যার সঙ্গে কথা হয়েছে বহু বছর পরও তার কণ্ঠ গেঁথে থাকে মেজবার স্মৃতিতে। অন্যের ফোন নম্বর নিজের ফোনে সঞ্চয় করা, সঞ্চয়কৃত নাম্বারের তালিকা থেকে প্রয়োজনীয় নাম্বারটি বের করা, অপশনে গিয়ে দরকারি কাজ সারা সবই হয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেজবাকে দিয়ে।
মেজবা জানায়, ‘আমি ছোট বেলা থেকে কিছু করার চেষ্টা করেছি। আমি জানতাম আমার পরিবার বেশিদিন আমার বোঝা বইতে চাইবেন না।’ বৈদ্যুতিক কাজের ঝুঁকি প্রসঙ্গে সে জানায়, ‘আমার কাছে ঝুঁকি মনে হয় না। ইলেক্ট্রিক কাজ করতে আমার ভাল লাগে।’

উঁচু গাছে উঠতে পারে মাসুদ :
মঘাদিয়ার গজারিয়া গ্রামের প্রবাসী নুরুজ্জামানের ছেলে মাসুদ খান। জন্মগত এ দৃষ্টি প্রতিবন্ধীকে দিয়ে খুব সহজে হয় খেতখামারের কাজ। গাছে গাছে চষে বেড়ানো, কৃষিকাজ, গরু-মহিষ লালন-পালন সবই হয় তাকে দিয়ে। দাম্পত্য জীবনে তার ঘরে আছে দুই ছেলে। নিজের কাজের পাশাপাশি অন্যকে সাহায্য করে বলে সবার কাছে বেশ প্রিয় ব্যক্তিও তিনি। গ্রামের মানুষের নারকেল, সুপারি ও তাল গাছে উঠে অন্যকে সাহায্য করতে গিয়ে কোন পারিশ্রমিকও নেন না। মাসুদ ধান কাটতেও পারদর্শী। হিরু-মেজবার মতো তিনিও মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন স্বাচ্ছন্দে। মাসুদ বলেন, ‘আমি চেষ্টা করি নিজে নিজের মত করে চলতে’।

বিশেষজ্ঞের কথা : তিন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী প্রসঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের ট্রাষ্ট্রি চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. রবিউল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কোন প্রশিক্ষণ ছাড়া সাধারণত এমন কাজ সম্ভব নয়। তবে ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক কিছু সম্ভব। চিকিৎসা বিজ্ঞান ইলেক্ট্রিক কাজের মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সাধারণত এরকম প্রতিবন্ধীদের উৎসাহ দেয় না। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের এমন কাজ করা ঠিক নয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!