তাদের ঈদ আনন্দ ফুটপাতে

তাদের ঈদ আনন্দ ফুটপাতে

মুুহাম্মদ দিদারুল আলম :::

এক.
প্রতিদিনই অন্যের জমিতে কামলা দেওয়া কিংবা ভ্যানগাড়ী ঠেলা অথবা রিকসার প্যাডেল ঘুরানোই তাদের পেশা। অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হয়। তারপরেও সংসারে সদস্য মা বাবা স্ত্রী সন্তানসহ সাত আটজনে গিয়ে ঠেকে। প্রত্যেকই তার আয়ের ওপর নির্ভর করে দুমুঠো খেয়ে বেঁচে আছে।
জীবন চক্রের নিয়মে জীবন চলে, তারই মধ্যে চলে আসলো রমজান মাস। রমজান মাসে যদিও কোন কোন শ্রমিকের কাজ কাম কম তার পরেও খরচটাও একটু বেশি মনে হয়। রমজান হতে না হতেই এসে পড়ে ঈদ। মাথায় পড়ে বাজ, চোখে মুখে কষ্টের চাপ।
চিন্তা যদিও মনে মনে করে বুকে আশা ঈদের দিন বাবা মা স্ত্রী সন্তানদের কিছু নতুন পোশাক কিনে দেওয়ার। তাই কেউ কেউ প্রতিদিন কাজ করতো আর সেই মজুরির টাকা সংসার খরচ করে কিছু রেখে দিতো।

দুই.
ঈদকে সামনে রেখে সন্তানদের ঈদ পোশাক কেনার জন্য প্রায় সময় বিভিন্ন দোকানে ঘুরা ঘুরি করতো করিম মিয়া। কিন্তু বড় বড় দোকানে অনেক সুন্দর সুন্দর পোশাক দেখে মনে হতো এটাই যেন তার সন্তানদের জন্য মানাবে! কিনে দিলে খুশি হবে। যখন দাম শুনে তখনই হিসাব করে দেখে যে দাম তার সাধ্যের মধ্যে নেই, তার সাধ্য এর চেয়ে অনেক কম। ফিরে আসে সেই সব মার্কেট থেকে। শেষ পর্যন্ত চলে আসতে হয় গরিব দুঃখী নিন্মবিত্তদের আশা পূরণের ফুটপাতে, রাস্তার ধারে লাইন ধরে করিম মিয়ার মত অনেকেই এখানকার ক্রেতা রেডিমেড ছোট্ট ছোট্ট দোকানগুলিতে। সেখান থেকে করিম মিয়ার মতো অনেকেই তাদের সাধ্যানুযায়ী ছেলে মেয়েদের ঈদের পোশাক কিনে।
করিম মিয়া ভাবে ভাগ্যিস ফুটপাত ছিলো! তা না হলে আমাদের মত গরীব মানুষ, দিনমজুর লোকজন কি করে তাদের সন্তানদের মুখে ঈদের আনন্দের হাসি ফুটাতো। কষ্ট করে হলেও মা বাবার জন্য অল্প দামে শাড়ি, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি টুপি কিনেছি এই ফুটপাত থেকে। পরিবাবের সবার জন্য কেনা হলেও বাদ যায় নিজে আর বউ। সাধ থাকলেও সাধ্য না থাকায় করিম মিয়া সান্তনা-নিজেদের জন্য তো গত বছর কিনছিলাম! মা বাবা সন্তানদের নতুন পোশাক দিয়েছি তাতেই আমাদের অনেক আনন্দ, অনেক শান্তি।

তিন.
অনেক টাকা খরচ করে ঈদের পোশাক কেনার সামর্থ নেই আমাদের সমাজের ভ্যান চালক, কৃষক, শ্রমিক দিনমজুরদের। কিন্তু সন্তানের আবদার রাখতে হবে তার। ঈদের দিনে এক টুকরো হাসির জন্য যেন সারাটা দিন মলিন না হয় বাবা হিসাবে সে চিন্তাও মাথায় ঘুরপাক খায়।
বিলাসবহুল মার্কেটগুলোর সামনে যেতেই যেনো ভয় হয়। দূর থেকে তাকিয়ে পুতুলের গায়ে পরানো পোশাক দেখেন। আর মনে মনে আঁকেন মেয়ের জামার ছবি কোনটা তার গায়ে মানাবে, প্রিয় মানুষটি গায়ে কি রংয়ের শাড়ি জড়ালে আরো ভালোবাসা বাড়বে। কিন্তু তিনি এও জানেন, এসব মার্কেট বা শো-রুম তার জন্য নয়। মার্কেটগুলোর ঠান্ডা বাতাসে তার শরীরে ঘামের গন্ধটা আরো বেড়ে যেতে পারে। ভয় নিয়ে পা বাড়ান না গফুর মিয়ারা।

চার.
প্রতিদিন সকালে মফস্বল জেলা শহরের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে বেকার দিনমজুরদের ভীড় দেখা যায়। অপেক্ষা কাজ পাওয়ার জন্য। শ্রমিক বেশী হওয়ায় হাজিরার টাকাও কম। তাছাড়া অভাবে পড়ে গ্রামীণ এলাকা থেকে শহরে এসে রিক্সা চালিয়ে উপার্জনের চেষ্টা করেন অনেকেই। সারাদিন রিক্সা চালানোর পর যা আয় করেন তা নিয়ে ঘরে ফিরে কোন রকমে দু’বেলা খাবার জোটে। এরকম অনেকেই সারাদিন অপেক্ষা করেও কোন কাজ না পেয়ে নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরেন। চালের টাকা যোগাড় করতে না পারায় প্রথম রোজা রাখতে পারেনি দিনমজুর হাশেম আলী ও তার পরিবারের সদস্যরা। যেখানে চালের টাকা যোগাড় হয় না সেখানে ঈদের খুশি কল্পনায় আসে না হাশেম আলীর।

পাঁচ.
কয়েক বছর ধরে বিছানায় শুয়ে দিন কাটছে সাদেক আলীর। দুই ছেলে আর চার মেয়ে নিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিন পার করছেন তিনি। সাদেক আলীর মেয়ে শিখা বলেন, ‘এক ভাই রিক্সা চালায়, আমি সেলাইয়ের কাজ করি। দুজনের আয় দিয়ে সংসার চলে। বাকীরা এখনো ছোট। তবে প্রতিদিন ৪০/৫০ টাকা বাবার ওষুধের পেছনে যায়।’ যেখানে সংসারই চলে না সেখানে আবার আমাদের ঈদে নতুন জামার শখ!

ছয়.
দিনমজুর আইজুল বলেন, “কাজ করলে টাকা পাই, কাজ না করলে টাকা নাই। সূর্য উঠার সাথে সাথেই চলে আসি কাজের সন্ধানে। কাজ না পাইলে কষ্ট করেই দিনটা পার করতে হয়।”
“দিনমজুরের আবার কিসের ঈদ। কাজ করে যে টাকা পাই সেই টাকায় সংসারের খরচ চলে। তবে সন্তানদের জন্য নতুন জামা কাপড় না কিনলেও সেমাই, চিনির জন্য টাকা জমায়ে রাখছি।”
আক্ষেপ করে আইজুল বলেন, “ছোটবেলা ঈদের আগে আমিও আব্বার কাছে বায়না ধরতাম নয়া কাপড় কিনার জন্য। তখন আব্বা বাজার থেকে জামা কিনে আনতেন কিন্তু প্যান্ট না কিনে দেওয়ায় কান্নাকাটি করতাম। এখন নিজেই একজন বাবা। সন্তানের চাহিদা পূরণ করার ইচ্ছে থাকলেও টাকার জন্য পারি না।’
দিনমজুরের পরিবারে সারা বছর অভাব লেগে থাকে। দিনে কাজ করে যে টাকা পাই সেই টাকায় বিকালে হাটে বাজার-খরচ করে সন্ধ্যার ও সকালের খাবারের জন্য চাউল আর তরকারি কিনি। হাতে আর কিছুই থাকে না।

সাত.
ঈদের দিন শহরের অধিকাংশ মানুষ শেকড়ের টানে বাড়ি গেলেও কিছু মানুষ রয়ে যান এই শহরে। যারা যেতে পারেননি, তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ শ্রমজীবী। এদের কেউ রিকশা চালান, কেউ লেগুনা, কেউ বাস আবার কেউ সিএনজি চালান। ঈদের দিন সবার জন্য আনন্দের হলেও তাদের অনেকের মনেই আনন্দ নেই। অভাব তাদের আনন্দ অনেকটাই ফ্যাকাসে করে দেয়। তাই তারা পরিবার-পরিজন ছেড়ে শহরে রয়ে যান। বাড়তি কিছু আয়ের জন্য তারা রাস্তায় নামেন।
এদিন যারা পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে বাইরে বের হয়েছেন, তাদেরকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন তারা। এই সময় আবার অনেকে রিকশায় করে ফাঁকা নগরী ঘুরে দেখার স্বাদ জাগে। সেই স্বাদও মেটান তারা। বিনিময়ে কিছু বকশিসে তাদের মুখে ঈষৎ হাসি। আর এভাবেই কাটে অনেক শ্রমজীবী মানুষের ঈদ আনন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!