খালেদা জিয়ার ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ এবং বিএনপির ভারতযাত্রা

খালেদা জিয়ার ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ এবং বিএনপির ভারতযাত্রা

বিভুরঞ্জন সরকার :::

রাজনীতির ময়দানে খুব সক্রিয় না থাকলেও ব্যাপকভাবেই আলোচনায় আছে বিএনপি। সরকারের সঙ্গে, সরকার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় পেরে না ওঠে বিএনপি এখন অন্য কৌশল নিয়ে অগ্রসর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিএনপি চায় সরকারকে দুর্বল করতে, জনবিচ্ছিন্ন প্রমাণ করতে। আর, সরকার চাইছে বিএনপিকে অকার্যকর করতে, মানুষের মন থেকে বিএনপির নাম মুছে দিতে। কিন্তু বিএনপির কৌশল হলো, ‘…তবু আমারে দেবো না ভুলিতে’ ।
বিএনপি সংসদে নেই। রাজপথে নেই, আন্দোলনে নেই। বিএনপি আছে নয়াপল্টনে, গুলশানে আর প্রেসক্লাবে। আছে গণমাধ্যমে, এমনকি আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে মুখেও বিএনপি আছে, এবং বেশ ভালোভাবেই আছে। বিএনপি সম্ভবত এভাবে থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাজের কাজ কিছু না করেও আলোচনায় থাকার যেসব উপায় দলটি বের করছে, কৌশল হিসেবে তা খারাপ নয়। সম্প্রতি বিএনপি আলোচনায় আছে তিন বিষয়ে – ১. কারাগারে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার অসুস্থতা, ২. তিন নেতার ভারত সফর এবং ৩. মহাসচিবের লন্ডন মিশন।

খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে জেলে আছেন ফ্রেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ থেকে। চার মাস হতে চললো। তাকে মুক্ত করার জন্য বিএনপি একদিকে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশিদের কাছে ধরনা দেওয়ার পাশাপাশি তার গুরুতর অসুস্থতার কথা বলে জনসাধারণের মধ্যে সহানুভূতি তৈরির চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। কোনোটাই এখন পর্যন্ত তেমন কাজ দিচ্ছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথমদিকে বিএনপি ভেবেছিল, আর যাই হোক, সরকার খালেদা জিয়াকে জেলে নেবে না। তাদের ধারণা ছিল বেগম জিয়াকে জেলে নিলে দেশে প্রবল আন্দোলন গড়ে উঠবে। দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবে। সরকারের ওপর এমন চাপ তৈরি হবে যা সহ্য করা সরকারের জন্য কঠিন হবে। বিএনপির ধারণা সত্য হয়নি। সরকারের ‘আচরণ’ যারা অপছন্দ করছেন তারাও বিএনপির হয়ে রাস্তায় নামার গরজ বোধ করেননি বা করছেন না।

খালেদা জিয়ার বয়স হয়েছে। তিনি অসুস্থ– এতে কারো কোনও সন্দেহ নেই। তবে তার অসুস্থতা কতটুকু ‘গুরুতর’ তা নিয়ে মনে হয় কারো কারো মনে সংশয় আছে। বিএনপির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয় এবং চিকিৎসকরা জানান, তার স্বাস্থ্যের বড় ধরনের কোনও সমস্যা পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিএনপি সমর্থক চিকিৎসকরা সেটা মানত চান না। তাদের কথা, বেগম জিয়াকে তার পছন্দের হাসপাতালে, পছন্দের চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। সরকারকে নরম করতে না পেরে এখন বিএনপি এবং সমর্থক চিকিৎসকরা বলছেন, বেগম জিয়ার ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ করছিল। ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা না দিলে যেকোনও মুহূর্তে যেকোনও কিছু ঘটে যেতে পারে! আতঙ্কের কথা। ভয়ের কথা। প্রশ্ন হলো, দেশের একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেত্রী, একটি বড় দলের প্রধান, যিনি একাধিকবার দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সরকার কি উদাসীনতা দেখাচ্ছে? নির্জন কারাবাসে ‘বেগম জিয়ার কিছু হলে’ পরিস্থিতি কি সরকারের অনুকূলে থাকবে?

বেগম জিয়ার ‘মাইল্ড স্ট্রোক’-এর খবর প্রচারের পর সকারের পক্ষ থেকে তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু খালেদা জিয়া তাতে রাজি নন। তিনি ইউনাইটেড হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও চিকিৎসা নেবেন না! বিএনপি নেত্রীর এই জেদের কারণ কি? তিনি তো এখন মুক্ত মানুষ নন। কারাবন্দি। তার চিকিৎসা তার ইচ্ছানুযায়ী হবে না। হবে কারাবিধি অনুযায়ী। এটা না মেনে বেগম জিয়া কি প্রমাণ করতেন চান? তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে? তিনি যা বলবেন তা-ই হওয়ার দিন যে এখন নেই, সেটা কেন যে তিনি মনে রাখেন না! তিনি যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন, তার অবস্থা যদি সংকটাপন্নই হয়ে থাকে, তাহলে তো তার আগে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন, কোথায় চিকিৎসা হচ্ছে, সেটা কি প্রাথমিকভাবে খুব বড় ব্যাপার? বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিএমএইচ আমাদের দেশে সেরা চিকিৎসা সেবা দেওয়ার দুই প্রতিষ্ঠান। এই দুই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে বেগম জিয়ার আপত্তির কারণ স্পষ্ট করে বলতে হবে। রোগী তার পছন্দ অনুযায়ী ডাক্তার এবং হাসপাতালে যাবেন– এটাই তো স্বাভাবিক– এমন কথা কেউ কেউ বলছেন। তারা ভুলে যাচ্ছেন, খালেদা জিয়া সাধারণ অবস্থায় নেই। তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।

কেউ হয়তো বলবেন, সরকারইবা এত জেদ ধরে আছে কেন? খালেদা জিয়ার ইচ্ছাপূরণ করলে কি সরকারের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে? সরকার কি খালেদা জিয়ার জন্য কারাবিধি ভঙ্গ করেনি? একজন নির্দোষ নারীকে বেগম জিয়ার জেলসঙ্গী হিসেবে দেওয়া হয়েছে কি কারাবিধি মেনে? বেগম জিয়ার প্রতি একটু উদার, মানবিক মনোভাব দেখালে সরকারের তো কোনও ক্ষতি নেই। বরং তাতে সরকারের প্রতি মানুষের সহানুভূতি বাড়বে।

যারা এমন সরল-সহজ কথা ভাবেন, তারা আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা মনে রাখেন না। আমরা আওয়ামী লীগের কাছে নমনীয়তা, উদারতা, মানবিকতা, সহনশীলতা– সবকিছু আশা করি। বিএনপির কাছে নয় কেন? বিএনপি কি কখনও কোনও কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি উদারতা দেখিয়েছে? জানি, এই প্রশ্নের জবাবে বলা হবে– আওয়ামী লীগ কেন বিএনপির কুপথ অনুসরণ করবে? আওয়ামী লীগের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। রাজনীতির হিসাব-নিকাশ অবশ্য রাজনীতি দিয়েই হয়। তাই খালেদা জিয়াকেই এবার উদারতা দেখিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। না হলে এটাই প্রমাণ হবে যে অসুস্থতা নিয়েও তিনি আসলে রাজনীতিই করছেন।
দুই.
সম্প্রতি বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফর করে এসেছে। বাংলাদেশে ‘প্রকৃত গণতান্ত্রিক আবহ প্রতিষ্ঠায়’ সাহায্য করার আর্জি নিয়ে বিএনপির তিন নেতা দিল্লি যান। প্রতিনিধিদলে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস-চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর। তারা সেখানে কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। তারা সেখানে যেসব কথা বলেছেন তা নিয়ে এখন নানামুখী আলোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিএনপি এখন ভারতের কাছে ধরনা দিয়ে এতদিনের ভারতবিরোধী ভাবমূর্তিতে নতুন চুনকাম করতে চান। বিএনপির রাজনীতির একটি বড় পুঁজি হলো ভারতবিরোধিতা। অথচ এখন এসে বিএনপি নেতারা অন্য কথা বলছেন।

সফরকারী দলের অন্যতম সদস্য হুমায়ুন কবীর, যিনি আবার লন্ডনে বসবাসরত বিএনপির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত, যেসব কথা বলেছেন সেগুলো দলের নেতারাও হজম করতে পারছেন না। আবার প্রকাশ্যে কিছু বলতেও পারছেন না তারেক রহমানের বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কায়! ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবীর বলেছেন, ‘পেছনের দিকে না তাকিয়ে সামনের দিকে তাকানো উচিত। গত শতকের ৮০ ও ৯০ দশকের রাজনীতি এখন বাতিল হয়ে গেছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল তা ভুল ও বোকামিপূর্ণ নীতির ফসল। ‘তারেক রহমান নিজেই ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক চান বলেও হুমায়ুন কবীর জানিয়েছেন। তার এসব বক্তব্যে দলের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছেন না। কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়ায় তাই এখন এখন সবাই দেখার চেষ্টা করছেন।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘বড় প্রতিবেশী ভারতের গঠনমূলক ভূমিকা চায় বিএনপি। কোনও একটি দলকে ভারত সহায়তা করুক- এটাও চায় না’।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন যদিও বলেছেন যে দলের পক্ষ থেকে কেউ ভারত গেছেন বলে তিনি জানেন না। তবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম লন্ডনে গিয়ে বিবিসির সঙ্গে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তা থেকেও এটা স্পষ্ট যে বিএনপি তার ভারতনীতিতে পরিবর্তন আনছে। চলমান বাস্তবতা বুঝে বিএনপি এখন ভারত তোষণের নীতি নিয়ে দেখতে চায় তাতে কি ফল পাওয়া যায়! গণমাধ্যমে এমন খবর ছাপা হয়েছে যে সফরকালে বিএনপি নেতারা কংগ্রেস ও বিজেপির কাছে দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করেছে। যেসব বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ আছে সেগুলো দূর করেছে, আবার নতুন আশ্বাসও দিয়েছে।

প্রশ্ন হলো, বিএনপির আশ্বাসে ভারত কতটুকু আশ্বস্ত হয়েছে? ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ভারত নাকি বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরামর্শ দিয়েছে। এ ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান সম্ভবত পরিষ্কার নয়। তবে ভারত যে বিএনপির কথায় বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছে না সেটা কারো কারে বক্তব্যে স্পষ্ট। ভারতের বিএনপি শাসনের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কূটনীতিকরা বিএনপির তৎপরতার ওপর নজর রাখছেন বলেই মনে হয়।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখার্জি বলেছেন, ‘ওরা (বিএনপি নেতারা) ৮০ ও ৯০ দশকের ভুল শুধরে সরে আসতে চাইছেন ভালো কথা, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০০১ সালের ভোটের আগে তারেক রহমান ঠিক এই ধরনের কথাই বলেছিলেন। ঠিক একইভাবে ভারতকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস জানে, ক্ষমতায় এসে তার দল কোন ভূমিকা নিয়েছিল। ভারতকে তারা বোকা বানিয়ে দিয়ছিল’।

বিএনপি ভারতের কাছে ধরনা দিচ্ছে, এটা হয়তো তাদের একটি নির্বাচনি কৌশল। তারা যেকোনও উপায়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুত চায়। ভারতকে সব ধরনের সুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকারও হয়তো তারা করতে কসুর করবে না। ভারতের কোনও সন্ত্রাসী সশস্ত্র গ্রুপকে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার কথাও তারা বলবে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তারা কী করবে বা করে সে অভিজ্ঞতা ভারতের আছে। বিএনপির ভারতবিরোধী রাজনীতি বদলের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ভারতের কাছে নেই। এক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য বিএনপিকে আরো অনেক পথ হাঁটতে হবে। কিন্তু তাতে আগামী নির্বাচনে বিএনপির বাড়তি কোনও সুবিধা হবে কি? মুখে ভারতবিরোধিতা করলেও বিএনপি যে তলে তলে ভারতের প্রতি কত নতজানু তা এবার বিএনপি নেতারাই প্রমাণ করছেন। আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করার জন্য বিএনপি এতদিন যে মহৌষধ ব্যবহার করে এসেছে সেটা এবার উল্টো আওয়ামী লীগই বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। বিএনপির ভারতবিরোধী ভোটাররা তা কীভাবে গ্রহণ করবে? ভারতের আনুকূল্য নিয়ে ভোটের রাজনীতিতে সুবিধা পেতে গিয়ে বিএনপি অসুবিধা বাড়াচ্ছে না তো?

লেখক: কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!